রাজশাহীতে নিয়ম ভেঙে সরকারি রাস্তা দখল করে আওয়ামী লীগ নেতা শামসুজ্জামান আওয়াল নির্মিত বহুতল বিপণি বিতান এখনও রয়েছে বহাল তবিয়তে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর মামলা মাথায় নিয়ে এই নেতা গা ঢাকা দিলেও অবৈধভাবে নির্মিত এই মার্কেট থেকে বিপুল আর্থিক সুবিধা ঠিকই নিয়ে চলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম ভেঙে সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে মার্কেট নির্মাণ করা হলেও মার্কেটের বরাদ্দ ও ভাড়া উত্তোলন এককভাবেই আওয়ালের দখলে রয়েছে।
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শামসুজ্জামান আওয়াল কোনোরকম দরপত্র ছাড়াই যৌথ অংশীদারিত্বর ভিত্তিতে ২০১২ সালে নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেববাজারে বৈশাখী মার্কেট নামের এই বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ পান। মেয়র হিসেবে লিটনের প্রথম মেয়াদে কাজ শেষ করতে পারেননি তিনি। ২০১৮ সালে লিটন দ্বিতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আবার সেই কাজ শুরু করেন তিনি। নির্মাণকাজ শুরুর আগে শর্ত ছিলো, ওই স্থানে আগে থেকে যারা ব্যবসা করছিলেন, তারা বরাদ্দে অগ্র্রাধিকার পাবেন। কিন্তু বছরের পর বছর কাজ ঝুলে থাকায় তাদেরকেও পোহাতে হয় নিদারুণ ভোগান্তি।
২০১৩ সালের ২৭ জুন রাজশাহীর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দায়ের করা এক মামলায় অভিযোগ করা হয়, তৎকালীন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সাহেববাজার কাঁচাবারে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত সরকারি রাস্তা দখল করে এই মার্কেট নির্মাণের বন্দোবস্ত করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ৫৯৯৬ নম্বর দাগের ওপর মার্কেটিটি নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ৫৯৪৩ নম্বর দাগটিও কোনোরকম অধিগ্রহণ কিংবা বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা ছাড়াই বৈশাখী মার্কেট নামের বহুতল মার্কেটে ব্যববহার করা হয়। পুরো মার্কেটটি নির্মাণের জন্য রাজশাহী উন্নয়ন কর্তপক্ষের (আরডিএ) কাছ থেকে নকশা অনুমোদনও নেয়া হয়নি, যা রীতিমতো আইন লঙ্ঘন। এমনকি সরকারিভাবে এই রাস্তা বন্ধের কোনো অনুমতিও নেয়া হয়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। বাদি রফিকুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম ও সালাহউদ্দিন এই মামলায় শামসুজ্জামান আওয়াল ছাড়াও রাসিক মেয়র, সচিব, আরডিএ ও জেলা প্রশাসনকে বিবাদী করেন।
বাদীদের অভিযোগ, এই মামলা দায়েরের পর থেকে শামসুজ্জামান আওয়াল বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করলেও তারা মামলা তুলে নেননি। তাদের দাবি, তৎকালীন স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তৎকালীন মেয়র লিটনের প্রত্যক্ষ মদদে শামসুজ্জামান আওয়াল মার্কেটটির নির্মাণকাজ চালিয়ে যান। এতে করে সরকারি সেই রাস্তাটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে সবজিবাজারে ঘুরপথে অন্য রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হন নগরবাসী। এই মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট েসেকেন্দার আলী জানান, মামলাটি এখনও বিচারাধীন। আগামী মার্চ মাসে শুনানির পরবর্তী নির্ধারিত তারিখ ধারয্য রয়েছে।
এদিকে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে শামসুজ্জামান আওয়াল রাজশাহী থেকে পালিয়ে ঢাকায় তার নিজ ফ্ল্যাটে আত্মগোপন করে থাকলেও বৈশাখী মার্কেট বরাদ্দ থেকে শুরু করে ভাড়া উত্তোলন সবই হচ্ছে তার নির্দেশ মোতাবেক। গত মঙ্গলবার সরেজমিন মার্কেট ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শামসুজ্জামান আওয়ালের ভাই রুবেল বর্তমানে এসব দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২১ সালে মার্কেটের কিছু অংশ সিটি কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়া হলেও বেশিরভাগ অংশই আওয়ালের দখলে রয়েছে এখনও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যবসায়ীরা জানান, আওয়ালের ভাই রুবেল ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে তাদেরকে কোনো সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, এর মধ্যেও একাধিকবার রাজশাহী এসেছিলেন আওয়াল। তবে প্রকাশ্যে বের হননি। আবার মাসখানেক আগে রাজশাহীর কয়েকজন ব্যবসায়ী ঢাকায় গিয়ে আওয়ালের বাসায় তার সঙ্গে দেখাও করে এসেছেন। অথচ পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই একটি মার্কেটেই নয় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আরও অন্তত ৪টি বহুতল মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা আওয়াল। অন্তত একটি মার্কেটে দোকান বরাদ্দের জন্য টাকা দিয়ে এক দশকেও দোকান বুঝে পাননি ব্যবসায়ীরা। একটি মার্কেটের নির্মাণকাজ এখনও শুরুই করতে পারেননি আওয়ামী লীগের এই প্রভাবশালী নেতা, যার বিরুদ্ধে চব্বিশের অভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার ওপর হামলায় অর্থ যোগান দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও শামসুজ্জামান আওয়ালের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তার ভাই রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তার সন্ধান জানেন না বলে দাবি করেন। অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, মার্কেটের সব কাজ নিয়ম মাফিকই হয়েছে।