Dhaka ০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৮ বছর কোমায় থেকেও পদোন্নতি, অনন্য দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১১:২৬:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২০
  • ৭৯৮ Time View

ছবি: কোমায় থাকা সেনা কর্মকর্তা দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা।

ডেস্ক রিপোর্ট : দীর্ঘ ৮ বছর কোমায় থাকা সেনা কর্মকর্তাকে কর্নেল পদে পদোন্নতি দিয়ে বিরল সম্মান প্রদর্শন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোমায় থাকা অবস্থায় কোন সেনা কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ওই সেনা কর্মকর্তার নাম দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর কোমায় থেকেও পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। হাসপাতালের বিছানাতেই তাকে পরানো হয় ব্যাচ।

২০১৩ সালের ১১ মার্চ হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন চৌকশ সেনা কর্মকর্তা দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। এরপর মস্তিষ্কের কিছু অংশ হারিয়ে ফেলে কার্যক্ষমতা। চলে যান কোমায়। সেখানেই কেটে গেছে জীবনের প্রায় আটটি বছর। পুরো সময় ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) অফিসার্স ওয়ার্ডের নন্দকুঁজা নামের একটি কক্ষে চিকিৎসাধীন তিনি। হাত-পা নাড়াতে পারলেও গভীর কোমায় আচ্ছন্ন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়া সেনাবাহিনীর চৌকস এই কর্মকর্তা কর্মক্ষম থাকলে হয়তো পৌঁছে যেতেন সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত শিখরে। কিন্তু জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা তাকে দেয়নি সেই সুযোগ। তবে বাহিনীর প্রতি তাছাওয়ারের অবদান ভুলে যায়নি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিদায় লগ্নে বিরল এক সম্মান পেলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাছাওয়ার রাজা। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ থেকে কর্নেল হিসেবে পদোন্নতির সম্মানে ভূষিত করা হয়।

বাহিনীর এই সম্মাননায় গর্বিত মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার জীবন সঙ্গী মোসলেহা মুনীরা রাজা ও তাদের তিন সন্তান। মোসলেহা মুনীরা রাজা বলেন, তার স্বামী চাইতেন তাদের দুই ছেলে বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিবেন। সন্তানেরাও নিয়োজিত হবেন দেশের সেবায়। কিন্তু স্বামীর অসুস্থতার পর সবকিছু পাল্টে গেলেও দেশপ্রেমিক বাবার আদর্শেই বড় হচ্ছে তিন সন্তান। মুনীরা আশাবাদী একদিন তার স্বামী সুস্থ হয়ে উঠবেন। ফিরে পাবেন স্বাভাবিক জীবন।

সিএমএইচের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ মজুমদার জানান, ‘কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার এ অসুস্থতাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন ইফেক্টস। হার্ট অ্যাটাকের পর হার্ট ফিরে আসলেও, ব্রেইন ফিরে আসেনি। ব্রেইনের নিচের অংশ ভালো। কিন্তু বাইরের যে অংশগুলো আমাদের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে জড়িত সেই এরিয়ার সেলগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। এজন্য জীবন চালানোর জন্য বেসিক বডির প্রটেকটিভ সিস্টেম ভালো থাকলেও হাইয়ার সাইকোলজিক্যাল ফাংশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ এ অবস্থা থেকে মুক্তির সুসংবাদ দিতে না পারলেও সিএমএইচ সবসময় তাছাওয়ার রাজার পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা বাউল শিল্পী হাছন রাজার বংশধর। ১৯৮৯ সালের ২৩ জুন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাজোয়া বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীন ইরাক-কুয়েত ও ২০০৭ সালে সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেন। প্রায় অর্ধ শতাধিক দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

চাকরি জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও লেখালেখিতে হাত পাকিয়েছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। কবি হাছন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়ে হাছন রাজা সমগ্র, মেজর জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে নিয়ে ‘ও জেনারেল মাই জেনারেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসসহ একাধিক বই লিখেছেন তিনি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

admin

Popular Post

রাজশাহী-৬ আসনে জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণার দ্বিতীয় দিন: গণসংযোগ ও জনজোয়ার

error: Content is protected !!

৮ বছর কোমায় থেকেও পদোন্নতি, অনন্য দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ

Update Time : ১১:২৬:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২০

ডেস্ক রিপোর্ট : দীর্ঘ ৮ বছর কোমায় থাকা সেনা কর্মকর্তাকে কর্নেল পদে পদোন্নতি দিয়ে বিরল সম্মান প্রদর্শন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোমায় থাকা অবস্থায় কোন সেনা কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ওই সেনা কর্মকর্তার নাম দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর কোমায় থেকেও পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। হাসপাতালের বিছানাতেই তাকে পরানো হয় ব্যাচ।

২০১৩ সালের ১১ মার্চ হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন চৌকশ সেনা কর্মকর্তা দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। এরপর মস্তিষ্কের কিছু অংশ হারিয়ে ফেলে কার্যক্ষমতা। চলে যান কোমায়। সেখানেই কেটে গেছে জীবনের প্রায় আটটি বছর। পুরো সময় ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) অফিসার্স ওয়ার্ডের নন্দকুঁজা নামের একটি কক্ষে চিকিৎসাধীন তিনি। হাত-পা নাড়াতে পারলেও গভীর কোমায় আচ্ছন্ন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়া সেনাবাহিনীর চৌকস এই কর্মকর্তা কর্মক্ষম থাকলে হয়তো পৌঁছে যেতেন সাফল্যের কাঙ্ক্ষিত শিখরে। কিন্তু জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা তাকে দেয়নি সেই সুযোগ। তবে বাহিনীর প্রতি তাছাওয়ারের অবদান ভুলে যায়নি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিদায় লগ্নে বিরল এক সম্মান পেলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাছাওয়ার রাজা। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) তাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ থেকে কর্নেল হিসেবে পদোন্নতির সম্মানে ভূষিত করা হয়।

বাহিনীর এই সম্মাননায় গর্বিত মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার জীবন সঙ্গী মোসলেহা মুনীরা রাজা ও তাদের তিন সন্তান। মোসলেহা মুনীরা রাজা বলেন, তার স্বামী চাইতেন তাদের দুই ছেলে বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিবেন। সন্তানেরাও নিয়োজিত হবেন দেশের সেবায়। কিন্তু স্বামীর অসুস্থতার পর সবকিছু পাল্টে গেলেও দেশপ্রেমিক বাবার আদর্শেই বড় হচ্ছে তিন সন্তান। মুনীরা আশাবাদী একদিন তার স্বামী সুস্থ হয়ে উঠবেন। ফিরে পাবেন স্বাভাবিক জীবন।

সিএমএইচের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ মজুমদার জানান, ‘কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজার এ অসুস্থতাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় হাইপোস্কিক স্মিমিক ইনজুরি টু ব্রেইন ইফেক্টস। হার্ট অ্যাটাকের পর হার্ট ফিরে আসলেও, ব্রেইন ফিরে আসেনি। ব্রেইনের নিচের অংশ ভালো। কিন্তু বাইরের যে অংশগুলো আমাদের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে জড়িত সেই এরিয়ার সেলগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়নি। এজন্য জীবন চালানোর জন্য বেসিক বডির প্রটেকটিভ সিস্টেম ভালো থাকলেও হাইয়ার সাইকোলজিক্যাল ফাংশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ এ অবস্থা থেকে মুক্তির সুসংবাদ দিতে না পারলেও সিএমএইচ সবসময় তাছাওয়ার রাজার পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্নেল দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা বাউল শিল্পী হাছন রাজার বংশধর। ১৯৮৯ সালের ২৩ জুন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাজোয়া বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অধীন ইরাক-কুয়েত ও ২০০৭ সালে সুদানে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেন। প্রায় অর্ধ শতাধিক দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

চাকরি জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও লেখালেখিতে হাত পাকিয়েছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। কবি হাছন রাজার জীবন ও কর্ম নিয়ে হাছন রাজা সমগ্র, মেজর জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে নিয়ে ‘ও জেনারেল মাই জেনারেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসসহ একাধিক বই লিখেছেন তিনি।