মহীয়সী নেত্রীর রাজসিক প্রাপ্তি
আবুল কালাম আজাদ
আজ ২৯ নভেম্বর,২০২৫, বেগম খালেদা জিয়া জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এভার কেয়ার হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন।জানি না, অতীতের মতো এবারও তিনি আবার হাত নেড়ে,হাস্যজ্জ্বোল মুখে বাসায় ফিরতে পারবেন কি না।তবে পুরো দেশবাসী সেই প্রত্যাশাই করেন।কারণ দীর্ঘ ১৬ বছরের গনতান্ত্রিক শুণ্যতার পর, ৫ আগস্ট ২০২৪ সুড়ঙ্গের দূর প্রান্তে, গনতন্ত্রের আলোর মৃদু ঝলকানি দেখা দিলেও,সেই আলোক রেখায় পৌছাতে হলেও,দেশের জন্য,গনতন্ত্রের জন্য,একটি স্থিতিশীল শাসন ব্যবস্থায়, উত্তরণের জন্য,বেগম খালেদা জিয়ার বেঁচে থাকা আজ ১৭ কোটি মানুষের শুধু চাওয়া পাওয়াই নয়,অপরিহার্যও বটে। এদেশ যতবার গণতান্ত্রিক শুণ্যতার মুখোমুখি হয়েছে,ততবারই, বেগম জিয়ার আগমন, জাতীকে আশার আলো দেখিয়েছে। অতি অল্প বয়সে বৈধব্য বরণ, অসহায়,অর্থশুন্য জীবনে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আত্মসুখের লড়াইয়ের পরিবর্তে,জাতির প্রয়োজনে হঠাৎ করেই,রাজনীতিতে আগমন ঘটলেও,গনতন্ত্র ফেরাতে,গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে,তাঁকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। ‘৮৬,৮৮ সালে এরশাদ-হাসিনার পাতানো নির্বাচনকে বয়কট করে,রাজনীতিতে টিকে থাকা ও নিজ দলের ঐক্য ধরে রাখার কঠিন পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এতোটা সহজসাধ্য ছিলো না।কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা,সততা ও গণতন্ত্রের প্রয়োজনে আপোষহীন মানসিকতার কাছে সবকিছুই হার মেনেছে।৯১ সালে সবাইকে তাক লাগিয়ে, নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে, সরকার গঠন করে,মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী সরকার প্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন।তাঁর এই রেকর্ড, আরেক নেত্রীর গাত্র দাহের কারণ হয়ে দাড়ায় এবং দীর্ঘকাল পরে, ভুয়া মামলায় সাজা দিয়ে,তাঁর গৌরবকে ম্লান করার ব্যর্থ চেষ্টা করে,তিনি শুধু ম্লানই হন নাই,এমনকি বিলীন হতে চলেছেন।’ ৯১,৯৬,২০০১ সালে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনকেই সবচে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলে মনে করা হয়।উক্ত তিনটি নির্বাচনে প্রতিবারই বেগম খালেদা জিয়া ৫ টি করে আসনে দাড়িয়ে, ৫ টিতেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন যা শুধু আমাদের দেশের ইতিহাসেই নয়,এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় আর কোন নেতা/ নেত্রীর ঝুলিতেও এ রেকর্ড নাই। তাঁর এই অসাধারণ প্রাপ্তিতে, যাদের গা জ্বলে,তারাই, ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে,এক হাস্যকর ভুয়া মামলায় জেল দিয়ে,নির্বাচনী ময়দান থেকে তাঁকে নির্বাসিত করেন।বহুবার ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে সাধারণ ক্ষমা চাওয়ার জন্য,রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দিয়ে চাপ সৃষ্টি করলেও,তিনি তার উঁচু মাথাকে সমুন্নত রেখে,কারাগারে গিয়েছেন,কিন্তু বিদেশে পালিয়ে যান নি,বা সরকারের করুণায় সাধারণ ক্ষমা গ্রহণ করেন নি। ৫ আগস্টে স্বৈরাচারের পতনের পর,সরকারবিহীন টালমাটাল পরিস্থিতিতে তিনি শান্ত অথচ, দৃঢ়তার সাথে রাষ্ট্রকে নৈরাজ্যের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। বর্তমান ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সাথে অনেক বিষয়ে বিএনপির মতভিন্নতা থাকলেও,শুধুমাত্র বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শেই বর্তমান সরকারকে স্থিতিশীল রাখতে,কোন কার্পণ্য দেখায়নি তাঁর দল। রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর এই মমত্ববোধই তাঁকে আজ বিএনপি নেত্রী থেকে দেশনেত্রীতে রুপান্তরিত করেছে।জাতীয় নেতা/ নেত্রীবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ হতেই পারেন,হয়েছেনও,কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার জন্য যেভাবে,সকল ভেদাভেদ ভুলে,সকল রাজনৈতিক দল,সুশীল সমাজ,সরকার প্রধান, রাষ্ট্র প্রধান, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ,বিদেশী নেতৃবৃন্দ, কুটনীতিকবৃন্দ সর্বোপরি আপামর সাধারণ মানুষ ,তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন– তা সত্যিই নজিরবিহীন। জামায়াতে ইসলামীর সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কে আপাতত একরকম শীতলতা বিরাজ করলেও,বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তাদের সৌজন্যবোধ,রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে এক নুতন মাত্রা এনে দিয়েছে। ‘১৮ সালে কারাগারে যাওয়ার আগে,পরে,রাজনৈতিক ময়দানে, সংসদে,মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে শেখ হাসিনা বহুবার অশ্লীল গালিগালাজ, রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত শব্দ প্রয়োগ করলেও,বেগম খালেদা জিয়া কখনো,ব্যক্তিগত আক্রমনাত্মক বা অশ্লীল শব্দ চয়ন করেন নাই।এমনকি শেখ হাসিনা যখন দেশ থেকে বিতাড়িত হলেন,বা সাজাপ্রাপ্ত হলেন, তখনও বেগম জিয়া কোন কটুবাক্য ঝেড়ে প্রতিশোধপরায়ণতা দেখাননি। জানি না,সামনের দিনে,নিকট ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থতি কেমন হবে,তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়,রাষ্ট্রের প্রয়োজনে,সুস্থ ধারার রাজনীতি অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে,তাঁর মতো একজন ‘ জাতীয় মুরুব্বি ‘র প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। হায়াত, মউত আল্লাহর হাতে।জানি না,তিনি সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন কি না,তবে অন্তিম মুহুর্তেও তিনি যে,ভালবাসায় সিক্ত হলেন,সে প্রাপ্তি টুকুই বা কয়জনের ভাগ্যে জোটে?

আবুল কালাম আজাদ,
প্রধান শিক্ষক, চৌগাছি মাধ্যমিক বিদ্যালয়,শ্রীপুর,মাগুরা।
চৌগাছী, শ্রীপুর,মাগুরা।