
রাজশাহীর মোহনপুরে সম্প্রতি বহিরাগত সোর্স লিটন (৩৫) র্যাব ও পুলিশের সোর্স পরিচয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার গ্রামের বাড়ি পুঠিয়া উপজেলার নন্দনপুর গ্রামে হলেও, বর্তমানে সে শ্বশুরবাড়ি মোহনপুর উপজেলায় বসবাস করছে। গতকাল শুক্রবার মোহনপুর থানা পুলিশ সোর্স লিটনকে আটক করে থানা হেফাজতে নেয়।
অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের হাতে আটক হওয়া সোর্স লিটন দাবিকৃত অর্থ না পেলে ফাঁসিয়ে দেয় মাদক বা অন্য কোন মামলায়। কখনও নিজেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাজে। আবার কখনও একা বা সংঘবদ্ধ হয়ে মাদক স্পট থেকে চাঁদা উঠানোসহ নানা অপরাধ করে বেড়ায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এদের আছে সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেট। কয়েকজন মিলে প্রশাসনের ফোর্স পরিচয়ে চাঁদাবাজি করে তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক সূত্রে এরা চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধ করেই চলেছে। তথ্য গোপন করার নামে সে মাদক ব্যবসায়ীসহ দাগী অপরাধীদের সঙ্গে আঁতাতও করে। লিটনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। থানা এলাকাতেই এদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলছে।
সরেজমিনে ও একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অপরাধীদের ধরতে অনেক ক্ষেত্রে সোর্স নিয়োগ করে পুলিশ। সোর্সদের দেয়া তথ্য নিয়ে পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করে। সোর্সের কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় এসব সোর্স নিজেদের পুলিশ পরিচয় দেয়। নিজেদের আর্থিক সুবিধা বা অনৈতিক সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের মিথ্যা তথ্য দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্যে বেআইনী কাজে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাও ফেঁসে যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লিটন কোনো চাকরি না করলেও বিভিন্ন সময় মোটরসাইকেল বা প্রাইভেটকারে করে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়ান। এভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে আদায় করে টাকা-পয়সা। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে তাদেরকে ডেভিল হান্ট অপারেশনের গ্রেফতার এড়াতে সে কাজ করে আসছিল। সে নিজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ‘প্রভাবশালী ব্যক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানের গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার কারণে ব্যর্থ হচ্ছে বহু অভিযান। বড় মাদক ব্যবসায়ীরা আগেই পালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি সোর্স লিটন নিজেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, সে সোর্সমানি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে মাদক নিয়ে তা স্থানীয় মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করে। অভিযানের সময় ভুয়া তথ্য দিয়ে পুলিশ সদস্যদেরও বিপাকে ফেলে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
থানা পুলিশ সুত্রে জানাগেছে, সোর্স লিটন নিজে পুলিশের মতো আচরণ করে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছে। এভাবেই সে ভয়ভীতি দেখিয়ে উপজেলা জুড়ে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া গতকাল মোহনপুর থানার মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে লিটন ওই অভিযানের তথ্য সংগ্রহ করে এবং গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির মায়ের ভিডিও ধারণ করে। জানা গেছে, সে এসব ভিডিও ব্যবহার করে এলাকার সাধারণ মানুষকে মাদক ব্যবসায়ী সাঁজানোর ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের পায়তারা করছিল।
উপজেলার জামতলা এলাকার মাদক ব্যবসায়ী পদ, তার ভাই ও কালুর কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক ১,৫০০ টাকা করে আদায় করে লিটন। এছাড়াও ভাতুড়িয়া গ্রামের মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেও নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে থাকে। এই টাকার বিনিময়েই তাদের মাদক ব্যবসা চলতে থাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে। স্থানীয়দের ভাষায়, “যত দিন টাকা দেয়, তত দিন শান্তি; না দিলেই মামলা।”
উপজেলার ঘাসিগ্রাম ঝালপুকুর আদিবাসীপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সোর্স লিটন পুলিশের চেয়েও বেশি দাপট দেখায়। যার সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই ব্যবহার করে।” তারা আরও জানান, “আদিবাসীপাড়ার কিছু চোলাইমদ ব্যবসায়ী মাসিক মাসোহারা দিয়ে সোর্স লিটনকে ম্যানেজ করে ব্যবসা চালাচ্ছে।
সোর্স লিটনকে আটকের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার যোগসাজশের চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। পরে মোহনপুর থানা পুলিশ লিটনকে আদালতের মাধ্যমে জেল হজতে প্রেরণ করেন।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, “এই সোর্সের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কেউ যদি অপরাধে জড়ায়, তবে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
গত ডিসেম্বর মাসে সোর্স লিটনসহ ৩/৪ জন মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পেছনে মাদক ব্যবসায়ী আরিফকে মেরে তার স্মার্ট ফোন ও নগদ ৫ হাজার টাকা কেড়ে নিয়েছে। দেড়মাস আগে পোল্লাকুড়ি গ্রামের রেজাকে মেরে টাকা ছিনিয়ে নেয়।
