Dhaka ০২:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানবাধিকারের মুখোশে প্রতারণার সাম্রাজ্য! ঝিনাইদহে জনতার হাতে আটক কথিত চেয়ারম্যান, উদ্ধার ভুয়া পরিচয়পত্র-ওয়াকিটকি ও প্রাইভেটকার

মানবাধিকারের মুখোশে প্রতারণার সাম্রাজ্য! ঝিনাইদহে জনতার হাতে আটক কথিত চেয়ারম্যান, উদ্ধার ভুয়া পরিচয়পত্র-ওয়াকিটকি ও প্রাইভেটকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঝিনাইদহ:
মানবাধিকার সংস্থার নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনের আদলে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ঝিনাইদহে কাজী মাহমুদুল হাসান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে স্থানীয় জনতা। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে দুটি লাইসেন্সবিহীন ওয়াকিটকি, একাধিক পরিচয়পত্র ও একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, আটক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা” এবং Centre For Enforcement of Human Rights and Legal Aid (CEHRLA)-এর চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, সংস্থার নামে সদস্য কার্ড বিক্রি, ভুয়া কমিটি গঠন এবং প্রশাসনিক পরিচয়ের অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে তিনি ঝিনাইদহে অবস্থান করছিলেন। মঙ্গলবার রাত প্রায় ৯টার দিকে ঝিনাইদহ সদর এলাকায় সন্দেহজনক কার্যক্রমের অভিযোগে জনতা তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, আটক ব্যক্তির কাছ থেকে সংস্থার পরিচয়পত্র, লাইসেন্সবিহীন ওয়াকিটকি এবং একটি প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে CEHRLA-এর নাম, সরকারি নিবন্ধন নম্বর, লোগো, ব্যানার, পরিচয়পত্র ও নথিপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। অভিযোগে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন— কাজী মাহমুদুল হাসান, মোঃ মইনুর রশীদ ও মোঃ সোলয়মান হাওলাদার।
অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের অমিত তালুকদার ও মাহমুদুল হাসান, ঝিনাইদহের মোঃ জুসেল এবং কক্সবাজারের মাহবুবুল আলম সবুজ। তাদের কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ, আবার কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানা গেছে।
তাদের দাবি, বিভিন্ন জেলায় অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি। বরং অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
সংস্থাটির প্রকৃত প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের অন্তত ৩৪টি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা “এন্টি করাপশন টিম (ACT)”, “ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম (CIT)” এবং “ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম (ERT)” নাম ব্যবহার করে নিজেদের প্রশাসনের অংশ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এমনকি প্রশাসনের আদলে পোশাক ব্যবহার ও ওয়াকিটকি বহনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হতো।
এদিকে কাজী মাহমুদুল হাসানের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এক অনুষ্ঠানে তিনি নিজেকে জাতিসংঘের “ক্রাইম শাখার সদস্য” বলে দাবি করেছিলেন। তবে অনুসন্ধানে তার পাসপোর্ট থাকার তথ্যও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
আরেক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, তাদের সংগঠনটি ২০০২ সালের ২৬ মার্চ সাত সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি। যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংগঠনটি মূলত ১৯৯৮ সালে নিবন্ধিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকার সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া পরিচয়পত্র বিতরণ, প্রশাসনিক কাঠামোর অনুকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এর গভীর তদন্ত প্রয়োজন।
এখন সবার নজর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের দিকে— অভিযোগের কতটুকু সত্যতা উঠে আসে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Tag :
About Author Information

admin

জনপ্রিয়

মানবাধিকারের মুখোশে প্রতারণার সাম্রাজ্য! ঝিনাইদহে জনতার হাতে আটক কথিত চেয়ারম্যান, উদ্ধার ভুয়া পরিচয়পত্র-ওয়াকিটকি ও প্রাইভেটকার

error: Content is protected !!

মানবাধিকারের মুখোশে প্রতারণার সাম্রাজ্য! ঝিনাইদহে জনতার হাতে আটক কথিত চেয়ারম্যান, উদ্ধার ভুয়া পরিচয়পত্র-ওয়াকিটকি ও প্রাইভেটকার

Update Time : ০২:০৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

মানবাধিকারের মুখোশে প্রতারণার সাম্রাজ্য! ঝিনাইদহে জনতার হাতে আটক কথিত চেয়ারম্যান, উদ্ধার ভুয়া পরিচয়পত্র-ওয়াকিটকি ও প্রাইভেটকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঝিনাইদহ:
মানবাধিকার সংস্থার নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনের আদলে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ঝিনাইদহে কাজী মাহমুদুল হাসান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে স্থানীয় জনতা। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে দুটি লাইসেন্সবিহীন ওয়াকিটকি, একাধিক পরিচয়পত্র ও একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, আটক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা” এবং Centre For Enforcement of Human Rights and Legal Aid (CEHRLA)-এর চেয়ারম্যান পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, সংস্থার নামে সদস্য কার্ড বিক্রি, ভুয়া কমিটি গঠন এবং প্রশাসনিক পরিচয়ের অপব্যবহারের উদ্দেশ্যে তিনি ঝিনাইদহে অবস্থান করছিলেন। মঙ্গলবার রাত প্রায় ৯টার দিকে ঝিনাইদহ সদর এলাকায় সন্দেহজনক কার্যক্রমের অভিযোগে জনতা তাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, আটক ব্যক্তির কাছ থেকে সংস্থার পরিচয়পত্র, লাইসেন্সবিহীন ওয়াকিটকি এবং একটি প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে CEHRLA-এর নাম, সরকারি নিবন্ধন নম্বর, লোগো, ব্যানার, পরিচয়পত্র ও নথিপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। অভিযোগে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন— কাজী মাহমুদুল হাসান, মোঃ মইনুর রশীদ ও মোঃ সোলয়মান হাওলাদার।
অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের অমিত তালুকদার ও মাহমুদুল হাসান, ঝিনাইদহের মোঃ জুসেল এবং কক্সবাজারের মাহবুবুল আলম সবুজ। তাদের কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ, আবার কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানা গেছে।
তাদের দাবি, বিভিন্ন জেলায় অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি। বরং অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
সংস্থাটির প্রকৃত প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দেশের অন্তত ৩৪টি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা “এন্টি করাপশন টিম (ACT)”, “ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম (CIT)” এবং “ইমারজেন্সি রেসপন্স টিম (ERT)” নাম ব্যবহার করে নিজেদের প্রশাসনের অংশ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এমনকি প্রশাসনের আদলে পোশাক ব্যবহার ও ওয়াকিটকি বহনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হতো।
এদিকে কাজী মাহমুদুল হাসানের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এক অনুষ্ঠানে তিনি নিজেকে জাতিসংঘের “ক্রাইম শাখার সদস্য” বলে দাবি করেছিলেন। তবে অনুসন্ধানে তার পাসপোর্ট থাকার তথ্যও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
আরেক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, তাদের সংগঠনটি ২০০২ সালের ২৬ মার্চ সাত সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি। যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংগঠনটি মূলত ১৯৯৮ সালে নিবন্ধিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকার সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া পরিচয়পত্র বিতরণ, প্রশাসনিক কাঠামোর অনুকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এর গভীর তদন্ত প্রয়োজন।
এখন সবার নজর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের দিকে— অভিযোগের কতটুকু সত্যতা উঠে আসে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।