
তেলের সংকট ও অতিরিক্ত চাহিদায় অস্থির হয়ে উঠেছে রাজশাহীর পাম্পগুলো। কোথাও কোথাও সরবরাহ না থাকায় বন্ধ রয়েছে অনেক পাম্প।
রাজশাহীর পবা উপজেলার শাহমখদুম বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থিত মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনে তীব্র জ্বালানি সংকট ও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সরবরাহ ঘাটতির কারণে সেই সুনাম হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।
পাম্প সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা প্রায় ১২ হাজার লিটার হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার লিটার, যা চাহিদার তুলনায় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার লিটার কম। অন্যদিকে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ৬ হাজার লিটার হলেও একদিন পরপর সরবরাহ মিলছে সাড়ে ৪ হাজার লিটার।
চলমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে জ্বালানি তেল সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় যানবাহন মালিকরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহ করতে পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রবণতায় পাম্প কর্তৃপক্ষ চাপে পড়ছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সন্ধ্যা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাম্পে পুলিশ মোতায়েন করে তাদের উপস্থিতিতেই তেল বিতরণ কার্যক্রম চালানো হয়।
চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে না পারায় পাম্প ম্যানেজার রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রতি মোটরসাইকেলে ১০০ টাকার তেল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
শুধু এই পাম্পেই নয়, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সরবরাহ না থাকায় পাম্প বন্ধও রাখতে হচ্ছে। এদিকে বোরো মৌসুম ও আলু উত্তোলনের কাজ শুরু হওয়ায় কৃষি খাতে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। পাম্পের বাইরে খোলা বাজারে পেট্রোল লিটারপ্রতি প্রায় ৩০ টাকা এবং ডিজেল ১৮ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা ও সরবরাহ সংকটের গুঞ্জনে সাধারণ মানুষ আগাম তেল সংগ্রহে ঝুঁকছেন। ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্টসহ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন চালকরা। কোথাও কোথাও কে আগে তেল নেবে তা নিয়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “রাত ৮টায় এসেছি, এখনো তেল পাইনি। ১০০ টাকার তেল নিয়ে কী হবে?”
অন্য এক চালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “শুনছি ঈদের পর তেল নাও পাওয়া যেতে পারে, দামও বাড়তে পারে। তাই আগেভাগেই ট্যাংকি ভর্তি করার চেষ্টা করছি।”
এদিকে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখা এবং বোরো মৌসুমে কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় সরকার জ্বালানি বিতরণে রেশনিংসহ সব ধরনের বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব বিতরণ পয়েন্টে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়েছে।
তবে বাস্তবে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় পাম্প মালিকরা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার রাকিবুল ইসলাম জানান, চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ পাওয়া গেলে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হতো এবং এ ধরনের হাহাকার সৃষ্টি হতো না। তিনি বলেন, তেল পাওয়া যাবে না—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মোটরসাইকেল চালকরা যদি আগের মতো স্বাভাবিকভাবে তেল কিনতেন, তাহলে এতো যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো না, এমনকি পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজনও পড়ত না। তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতি যতদিন চলবে, ততদিন তিনি নিজে এবং পাম্প—দুটোকেই নিরাপদ মনে করছেন না। তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে তিনি সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এবিষয়ে বক্তব্য জানতে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে একাধিক বার কল করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহল মনে করছে, গুজবে কান না দিয়ে স্বাভাবিক চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি গ্রহণ এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারে।
নিজস্ব প্রতিনিধি 


















