Dhaka ০৯:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তেল পাচার-স্বজনপ্রীতির অভিযোগে কেশরহাটে উত্তেজনা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিরতার মধ্যে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটে অবস্থিত রহমান ফিলিং স্টেশনকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে।

এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক ও কৃষকরা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত দামে তেল না পেয়ে অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন, অন্যদিকে একটি প্রভাবশালী চক্র কালোবাজারে তেল বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

সরকারের পক্ষ থেকে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ও মজুতদারি ঠেকাতে প্রতিটি পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ কঠোর নজরদারির নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গত ৩১ মার্চ রাত থেকেই রহমান ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাইনের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও অধিকাংশ গ্রাহক তেল না পেয়ে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ করেন।

ট্যাগ অফিসার ও পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জটিলতা তৈরি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পাম্প মালিক মিজানুর রহমান (মিজান) পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে তেল সরবরাহ করছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ গ্রাহকদের উপেক্ষা করে লাইনের বাইরে থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ট্যাংক পূর্ণ করে তেল দেওয়া হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের একজন বলেন, “রাত থেকে লাইনে থেকেও তেল পাইনি, অথচ পরিচিতদের সহজেই তেল দেওয়া হচ্ছে—এটি চরম বৈষম্য।” প্রতিবাদ জানালে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল না পাওয়ায় জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কৃষক আল আমিন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে তেলের জন্য ঘুরছি, না পেয়ে ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।”

স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলও এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একাধিক ফেসবুক পোস্টে পাম্পে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, রাতের আঁধারে বিপুল পরিমাণ ডিজেল অবৈধভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে বাগমারা, তানোর ও মান্দা এলাকায়। ফলে পাম্পে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও বাইরে চড়া দামে তেল বিক্রি হচ্ছে।

বর্তমানে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কালোবাজারে ডিজেল ও পেট্রোল দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

৩১ মার্চ ত্রিমোহনী বাজারে কাগজপত্রবিহীন প্রায় ২০০ লিটার ডিজেলসহ এক ব্যক্তিকে আটকের ঘটনায় তেল পাচারের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ওই তেল জব্দ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি অবৈধ মজুত, কালোবাজারি, প্রতারণা এবং সরকারি নির্দেশ অমান্য করার শামিল, যা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এমনকি দণ্ডবিধির আওতায় কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে মেসার্স রহমান ফিলিং স্টেশন মালিক মিজানুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসনসহ ট্যাগ অফিসার আমাকে যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে আমি সেভাবে তেল বিতরণ করেছি। প্রশাসনিক নির্দেশনার কারণে তেল না পেয়ে যদি কেউ ফেরত যায় এ দায়ভার কি আমার? ওরা যেভাবে আমার হাত বেধে দিয়েছিল তা বলা যাবেনা।

মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, “রহমান ফিলিং স্টেশনে তেল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সচেতন মহল মনে করছে, অবৈধ বিক্রি বন্ধ, ট্যাগ অফিসারদের কার্যকর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং পাম্পগুলোতে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করলে এ ধরনের অনিয়ম কমানো সম্ভব।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রহমান ফিলিং স্টেশনের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিতের দাবি

Tag :
About Author Information

Alauddin Mondal

তেল পাচার-স্বজনপ্রীতির অভিযোগে কেশরহাটে উত্তেজনা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি

error: Content is protected !!

তেল পাচার-স্বজনপ্রীতির অভিযোগে কেশরহাটে উত্তেজনা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি

Update Time : ০৭:৪৮:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিরতার মধ্যে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটে অবস্থিত রহমান ফিলিং স্টেশনকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে।

এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহক ও কৃষকরা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্ধারিত দামে তেল না পেয়ে অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন, অন্যদিকে একটি প্রভাবশালী চক্র কালোবাজারে তেল বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

সরকারের পক্ষ থেকে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ও মজুতদারি ঠেকাতে প্রতিটি পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ কঠোর নজরদারির নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গত ৩১ মার্চ রাত থেকেই রহমান ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাইনের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও অধিকাংশ গ্রাহক তেল না পেয়ে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ করেন।

ট্যাগ অফিসার ও পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জটিলতা তৈরি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পাম্প মালিক মিজানুর রহমান (মিজান) পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে তেল সরবরাহ করছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ গ্রাহকদের উপেক্ষা করে লাইনের বাইরে থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ট্যাংক পূর্ণ করে তেল দেওয়া হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের একজন বলেন, “রাত থেকে লাইনে থেকেও তেল পাইনি, অথচ পরিচিতদের সহজেই তেল দেওয়া হচ্ছে—এটি চরম বৈষম্য।” প্রতিবাদ জানালে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেল না পাওয়ায় জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কৃষক আল আমিন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে তেলের জন্য ঘুরছি, না পেয়ে ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।”

স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলও এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একাধিক ফেসবুক পোস্টে পাম্পে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, রাতের আঁধারে বিপুল পরিমাণ ডিজেল অবৈধভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে বাগমারা, তানোর ও মান্দা এলাকায়। ফলে পাম্পে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও বাইরে চড়া দামে তেল বিক্রি হচ্ছে।

বর্তমানে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কালোবাজারে ডিজেল ও পেট্রোল দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

৩১ মার্চ ত্রিমোহনী বাজারে কাগজপত্রবিহীন প্রায় ২০০ লিটার ডিজেলসহ এক ব্যক্তিকে আটকের ঘটনায় তেল পাচারের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ওই তেল জব্দ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি অবৈধ মজুত, কালোবাজারি, প্রতারণা এবং সরকারি নির্দেশ অমান্য করার শামিল, যা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল এমনকি দণ্ডবিধির আওতায় কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে মেসার্স রহমান ফিলিং স্টেশন মালিক মিজানুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসনসহ ট্যাগ অফিসার আমাকে যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে আমি সেভাবে তেল বিতরণ করেছি। প্রশাসনিক নির্দেশনার কারণে তেল না পেয়ে যদি কেউ ফেরত যায় এ দায়ভার কি আমার? ওরা যেভাবে আমার হাত বেধে দিয়েছিল তা বলা যাবেনা।

মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, “রহমান ফিলিং স্টেশনে তেল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সচেতন মহল মনে করছে, অবৈধ বিক্রি বন্ধ, ট্যাগ অফিসারদের কার্যকর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং পাম্পগুলোতে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করলে এ ধরনের অনিয়ম কমানো সম্ভব।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রহমান ফিলিং স্টেশনের কার্যক্রম সাময়িক স্থগিতের দাবি