আদালতে একাধিক মামলায় দণ্ডিত ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অংশ নিচ্ছেন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেও নির্বিঘ্নে অবস্থান করতে দেখা যাচ্ছে তাকে। শেষ পর্যন্ত ওই আসামির পাশেই দেখা গেছে থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি)। অথচ তার বিরুদ্ধে থানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার তথ্য রয়েছে প্রায় এক বছর ধরে।
রাজশাহীর মোহনপুরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এলাকাতেই প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাকে গ্রেফতারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার। মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌর বিএনপির উদ্যোগে দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও পরোয়ানাভুক্ত আসামি শাহীন আলমকে প্রকাশ্যে অংশ নিতে দেখা যায়। অনুষ্ঠানে মোহনপুর থানার একাধিক পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তারা আসামির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি। একপর্যায়ে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান সেখানে উপস্থিত হলে শাহীন আলমকে তার একদম কাছাকাছি অবস্থানে দেখতে পাওয়া যায়। পুরো দৃশ্যটি প্রতিবেদকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
কে এই শাহীন আলম?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাহীন আলম (৪৫) মোহনপুর উপজেলার হরিদাগাছি গ্রামের ইসমাইল স্বর্ণকারের ছেলে।
আদালত ও ইসলামী ব্যাংক সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় সাজা ঘোষণা করা হয়েছে:
সিআর মামলা নম্বর ২৩৭/১৯ (সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১, রাজশাহী): দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট-এর ১৩৮ ধারায় ১ বছরের কারাদণ্ড ও ২১ লাখ ৮৬ হাজার ২৪১ টাকা অর্থদণ্ড।
সিআর মামলা নম্বর ২৯৮/১৮ (যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ-২ আদালত): একই আইনের ১৩৮ ধারায় ১ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।
দায়রা মামলা নম্বর ৮১৮/২০ (জেলা যুগ্ম জজ-১ আদালত): ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ ৮০ হাজার ৩৪১ টাকা অর্থদণ্ড (আপিল আদালত কর্তৃক আবেদন খারিজের নথি বিদ্যমান)।
দায়রা মামলা নম্বর ৮০৫/২০ (অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত-৪): ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ২ লাখ ৩১ হাজার ৩৮৬ টাকা অর্থদণ্ড।
জিআর মামলা নম্বর ১৭৮ / এফআইআর ৩/১৭৮ (মোহনপুর থানা): দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৫০৬ ও ১১৪ ধারায় ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
এছাড়াও শাহীন আলমের বিরুদ্ধে আদালতে প্রায় ২৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯ ৯০ টাকার একটি অর্থঋণ মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও ব্যাংক কর্মকর্তার দাবি:
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এতগুলো মামলায় সাজা হওয়া সত্ত্বেও শাহীন আলম নিয়মিত এলাকাতেই থাকেন। থানা গেট, উপজেলা চত্বর, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান এমনকি নিজ চেম্বারেও তাকে পাওয়া যায়। পুলিশের চোখের সামনে সাজাপ্রাপ্ত আসামি এভাবে ঘুরে বেড়ালেও তাকে কেন ধরা হচ্ছে না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ। কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ তুললেও তার স্বপক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
মামলার বাদীপক্ষ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের কেশরহাট এসএমই শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু বাকার বলেন, "আসামিকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তারা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছেন। পুলিশ বলে—‘আমরা আসামিকে খুঁজে পাচ্ছি না, আপনারা দেখিয়ে দেন।’ এরপরও আজ ধরব, কাল ধরব বলে দিন পার করা হচ্ছে।"
পুলিশ যা বলছে:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, "আসামিকে আমার চেনা নেই। তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে কি না, তাও জানা নেই। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।"
পরবর্তীতে রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মো. মামুন অর রশীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, ঘটনাটি তাঁর জানা ছিল না। ওয়ারেন্ট সংক্রান্ত তথ্য ও প্রমাণ নিয়ে কার্যালয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রমাণ পাওয়া গেলে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল মনে করেন, আদালতের দেওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন করা পুলিশের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সাজাপ্রাপ্ত আসামির উপস্থিতিতে রাজনৈতিক সভা কিংবা ওসির পাশে অবস্থান করার পর ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’ বা ‘চেনেন না’—এমন দাবি পুলিশের দায়িত্বশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।