Dhaka ০৯:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঋণের আশা দেখিয়ে এনজিও সদস্যের ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প আত্মসাতের অভিযোগ

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৮:২০:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১২ Time View

স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পাঁচ লাখ টাকা ঋণের আশায় ‘আশা’ এনজিওর সদস্য হয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারঘরিয়া এলাকার মোসা. রুমা বেগম (৩৬)। কিন্তু ঋণ পাওয়ার বদলে তাঁর কাছ থেকে সঞ্চয়ের টাকা, মা-মেয়ের স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক এনজিও কর্মীর বিরুদ্ধে। বর্তমানে ওই চেক ও স্ট্যাম্প উদ্ধারে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অসহায় এই নারী।

​ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে:-

ভুক্তভোগী রুমা বেগমের অভিযোগ, গত ২৪ মে ‘আশা’ এনজিওর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এমএমই শাখার কর্মকর্তা মো. সুজন আলী তাঁর বাড়িতে গিয়ে সদস্য করার নামে ৫০০ টাকা ভর্তি ফি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি সংগ্রহ করেন। এরপর গত ৪ জুন ঋণের জন্য ৫০ হাজার টাকা সঞ্চয় প্রয়োজন বলে জানান সুজন। নিজে উপস্থিত না থাকতে পেরে তিনি আলামিন নামের এক সদস্যের কথামতো তাঁর হাতে ৫০ হাজার টাকা দেন রুমা।

​এর চার দিন পর পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলে রুমা ও তাঁর মেয়ে তারিন আক্তার জুঁইয়ের দুটি করে স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক নেন সুজন। এ ছাড়া ঋণের কাগজপত্রের অজুহাতে মেয়ের এনআইডি ও ছবি, তিনজন গ্যারান্টারের কাগজপত্র এবং ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল ফাঁকা স্ট্যাম্পে রুমা ও তাঁর মেয়ের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

​চেক নিয়ে টালবাহানা ও তৃতীয় পক্ষের হাতে হস্তান্তর:-

পরবর্তীতে ঋণ দেওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে দুই দফায় ৪৮ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হলেও বাকি ২ হাজার টাকা, চেক ও স্ট্যাম্পগুলো ফেরত দেননি সংশ্লিষ্ট কর্মী সুজন। চেক ফেরত চাইলে তিনি কখনো আলামিনের কাছে আছে বলে কালক্ষেপণ করতে থাকেন।

​উপায় না পেয়ে রুমা ৪ নম্বর বারঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ করেন। গত ৩১ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশের ভিত্তিতে সুজন উপস্থিত হয়ে লিখিত জানান যে তিনি চেকগুলো আলামিনকে ফেরত দিয়েছেন। তবে রুমা কোনো চেক হাতে পাননি। পরবর্তীতে সুজন দাবি করেন, আলামিন নাকি চেকগুলো রুমার মেয়ের সাবেক স্বামী জাফর ইকবালের মেয়ের জামাই আব্দুল্লাহর কাছে দিয়েছেন।

​এ বিষয়ে বারঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হারেস আলী বলেন, “রুমা চেক উদ্ধারের জন্য অভিযোগ করেছিলেন। সুজন চেকগুলো আলামিনকে দিয়েছেন মর্মে লিখিত দিয়েছেন। কিন্তু যার চেক, তাঁর কাছেই ফেরত দেওয়া উচিত ছিল। একজনের চেক আরেকজনকে দেওয়া ঠিক হয়নি।”

​সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:-

অভিযোগের বিষয়ে এনজিও কর্মী সুজন আলী বলেন, “আমি চেকগুলো আলামিনের হাতে দিয়েছি। আলামিন বলেছে, সে চেকগুলো আব্দুল্লাহ নামে একজনকে দিয়েছে। তাঁর কাছ থেকে আমি চেকগুলো উদ্ধার করতে পারিনি।”

​অন্যদিকে অভিযুক্ত আলামিন দাবি করেন, “আশা এনজিওর কর্মী সুজন আলী রুমাকে ফেরত দেওয়ার জন্য আমাকে চারটি চেক দেন। কিন্তু রুমাকে চেকগুলো ফেরত দেওয়ার আগেই আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়। রুমার সাবেক জামাই জাফর ইকবালের মেয়ের জামাই আব্দুল্লাহ রুমার কথা বলে আমার কাছ থেকে চারটি চেক নিয়ে চলে যান। এখন চেকগুলো আমার কাছেও নেই, রুমার কাছেও নেই।”

​রুমা বেগম এ বক্তব্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কাউকে তাঁর স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক বা স্ট্যাম্প অন্যের কাছে দেওয়ার কোনো অনুমতি দেননি। তাঁর আশঙ্কা, এসব কাগজ ব্যবহার করে তাঁকে বা তাঁর মেয়েকে বড় ধরনের আর্থিক বা আইনি হয়রানিতে ফেলা হতে পারে। মেয়ের সাবেক স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জেরে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এবং তাঁর ব্যাংক হিসাবও বিভিন্ন সময়ে অনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।

​এনজিও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া:-

এ বিষয়ে ‘আশা’র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ম্যানেজার মাজাহারুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।” তবে শাখা ব্যবস্থাপকের ভাষ্য, ঋণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো সদস্যের কাছ থেকে এ ধরনের নথি নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে তাঁর কর্মকর্তা সুজন আলী ভুল করে থাকলে বিষয়টি সুরাহায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

​‘আশা’র রাজশাহী বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “নিয়মের বাইরে কাজ করলে ওই কর্মীর বিরুদ্ধে অফিসিয়াল ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

​ঋণ অনুমোদনের আগে স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া, সেগুলো সংরক্ষণ এবং তৃতীয় ব্যক্তির হাতে চলে যাওয়ার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগী রুমা বেগম। নিজের চেক ও স্ট্যাম্প উদ্ধারে তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Tag :
About Author Information

Alauddin Mondal

জনপ্রিয়

বাঘায় পরকীয়ার অভিযোগে জামাত নেতা হাফিজুর কট, মারধর, বাড়িতে আগুন

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঋণের আশা দেখিয়ে এনজিও সদস্যের ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প আত্মসাতের অভিযোগ

Update Time : ০৮:২০:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পাঁচ লাখ টাকা ঋণের আশায় ‘আশা’ এনজিওর সদস্য হয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারঘরিয়া এলাকার মোসা. রুমা বেগম (৩৬)। কিন্তু ঋণ পাওয়ার বদলে তাঁর কাছ থেকে সঞ্চয়ের টাকা, মা-মেয়ের স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক এনজিও কর্মীর বিরুদ্ধে। বর্তমানে ওই চেক ও স্ট্যাম্প উদ্ধারে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অসহায় এই নারী।

​ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে:-

ভুক্তভোগী রুমা বেগমের অভিযোগ, গত ২৪ মে ‘আশা’ এনজিওর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এমএমই শাখার কর্মকর্তা মো. সুজন আলী তাঁর বাড়িতে গিয়ে সদস্য করার নামে ৫০০ টাকা ভর্তি ফি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি সংগ্রহ করেন। এরপর গত ৪ জুন ঋণের জন্য ৫০ হাজার টাকা সঞ্চয় প্রয়োজন বলে জানান সুজন। নিজে উপস্থিত না থাকতে পেরে তিনি আলামিন নামের এক সদস্যের কথামতো তাঁর হাতে ৫০ হাজার টাকা দেন রুমা।

​এর চার দিন পর পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলে রুমা ও তাঁর মেয়ে তারিন আক্তার জুঁইয়ের দুটি করে স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক নেন সুজন। এ ছাড়া ঋণের কাগজপত্রের অজুহাতে মেয়ের এনআইডি ও ছবি, তিনজন গ্যারান্টারের কাগজপত্র এবং ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল ফাঁকা স্ট্যাম্পে রুমা ও তাঁর মেয়ের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।

​চেক নিয়ে টালবাহানা ও তৃতীয় পক্ষের হাতে হস্তান্তর:-

পরবর্তীতে ঋণ দেওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে দুই দফায় ৪৮ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হলেও বাকি ২ হাজার টাকা, চেক ও স্ট্যাম্পগুলো ফেরত দেননি সংশ্লিষ্ট কর্মী সুজন। চেক ফেরত চাইলে তিনি কখনো আলামিনের কাছে আছে বলে কালক্ষেপণ করতে থাকেন।

​উপায় না পেয়ে রুমা ৪ নম্বর বারঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ করেন। গত ৩১ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশের ভিত্তিতে সুজন উপস্থিত হয়ে লিখিত জানান যে তিনি চেকগুলো আলামিনকে ফেরত দিয়েছেন। তবে রুমা কোনো চেক হাতে পাননি। পরবর্তীতে সুজন দাবি করেন, আলামিন নাকি চেকগুলো রুমার মেয়ের সাবেক স্বামী জাফর ইকবালের মেয়ের জামাই আব্দুল্লাহর কাছে দিয়েছেন।

​এ বিষয়ে বারঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হারেস আলী বলেন, “রুমা চেক উদ্ধারের জন্য অভিযোগ করেছিলেন। সুজন চেকগুলো আলামিনকে দিয়েছেন মর্মে লিখিত দিয়েছেন। কিন্তু যার চেক, তাঁর কাছেই ফেরত দেওয়া উচিত ছিল। একজনের চেক আরেকজনকে দেওয়া ঠিক হয়নি।”

​সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:-

অভিযোগের বিষয়ে এনজিও কর্মী সুজন আলী বলেন, “আমি চেকগুলো আলামিনের হাতে দিয়েছি। আলামিন বলেছে, সে চেকগুলো আব্দুল্লাহ নামে একজনকে দিয়েছে। তাঁর কাছ থেকে আমি চেকগুলো উদ্ধার করতে পারিনি।”

​অন্যদিকে অভিযুক্ত আলামিন দাবি করেন, “আশা এনজিওর কর্মী সুজন আলী রুমাকে ফেরত দেওয়ার জন্য আমাকে চারটি চেক দেন। কিন্তু রুমাকে চেকগুলো ফেরত দেওয়ার আগেই আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়। রুমার সাবেক জামাই জাফর ইকবালের মেয়ের জামাই আব্দুল্লাহ রুমার কথা বলে আমার কাছ থেকে চারটি চেক নিয়ে চলে যান। এখন চেকগুলো আমার কাছেও নেই, রুমার কাছেও নেই।”

​রুমা বেগম এ বক্তব্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কাউকে তাঁর স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক বা স্ট্যাম্প অন্যের কাছে দেওয়ার কোনো অনুমতি দেননি। তাঁর আশঙ্কা, এসব কাগজ ব্যবহার করে তাঁকে বা তাঁর মেয়েকে বড় ধরনের আর্থিক বা আইনি হয়রানিতে ফেলা হতে পারে। মেয়ের সাবেক স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জেরে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এবং তাঁর ব্যাংক হিসাবও বিভিন্ন সময়ে অনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।

​এনজিও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া:-

এ বিষয়ে ‘আশা’র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ম্যানেজার মাজাহারুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।” তবে শাখা ব্যবস্থাপকের ভাষ্য, ঋণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো সদস্যের কাছ থেকে এ ধরনের নথি নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে তাঁর কর্মকর্তা সুজন আলী ভুল করে থাকলে বিষয়টি সুরাহায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

​‘আশা’র রাজশাহী বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “নিয়মের বাইরে কাজ করলে ওই কর্মীর বিরুদ্ধে অফিসিয়াল ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

​ঋণ অনুমোদনের আগে স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প নেওয়া, সেগুলো সংরক্ষণ এবং তৃতীয় ব্যক্তির হাতে চলে যাওয়ার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগী রুমা বেগম। নিজের চেক ও স্ট্যাম্প উদ্ধারে তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।