সাতক্ষীরা জেলায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়েছে। গত রবিবার ৮জন নতুন সংক্রমিতসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৩৩ জনে। আক্রান্তের দিক থেকে এখন নতুন হটস্পট হচ্ছে সাতক্ষীরা। তবে জেলায় আইসিইউ ও শয্যা সংখ্যা সংকট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে বাড়তে থাকলে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে ঢাকা এবং চট্টগ্রামকেও। ঢাকাসহ সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা চলমান থাকায় জেলার মানুষের মধ্যে করোনা সংক্রমণের ঝুুঁকি প্রবল।
সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে সূত্রে প্রকাশ, করোনার সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য জেলায় ১৪০ শয্যার বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫টি করে মোট ৩০ ও সদর হাসপাতালে ১০। এছাড়াও আইসিইউ রয়েছে ৮টি। গত ৮ মার্চ দেশে সর্বপ্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলেও জেলায় গত ২৬ এপ্রিল ২০২০ করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় এবং অফিসিয়ালি জেলায় প্রথম ৩০ এপ্রিল করোনা রোগী শনাক্ত দেখানো হয়।
শুরুর দিকে সংক্রমণের সংখ্যা কম থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। গত ২৪ ঘন্টায় ৮ জন ব্যক্তির শরীরে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে। এনিয়ে জেলায় সর্বমোট করোনা রোগীর সংখ্যা ১২৩৩ জন। এরমধ্যে সুস্থ্য হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন ১১৪৫ জন। এদিকে এই ভাসরাসে ৩৭ জন রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। অপরদিকে এই ভাইরাসের উপসর্গে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৫ জন। বর্তমানে ৪১জন রোগী এই ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এ পর্যন্ত ৭৩২৬ জন রোগীর স্যাম্পল গ্রহণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৭১৯১ জনের করোনা রেজাল্ট এসেছে নেগেটিভ। তবে ১ম ডোজ করোনা টিকা গ্রহণ করেছেন ৮১৬৭১ জন আর ১০১০২ জন ২য় ডোজ গ্রহণ করেছেন।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা: রুহুল কুদ্দস জানান, করোনা রোগীদের জন্য ১০০ শয্যার বেড প্রস্তুত রয়েছে। ওই বেডের মধ্যে ৪১ জন রোগী করোনা উপস্বর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে। এছাড়াও এখানে ১২টি আইসিইউ রয়েছে। এরমাঝে ৮ করোনা রোগী ভর্তি রয়েছে। রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ নেবো।
এব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা: হুসাইন সাফাওয়াত জানান, সারাদেশের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে আন্ত:যোগাযোগের কারণে এখানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই আন্ত:যোগাযোগ আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। এখন এই ব্যবস্থা বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন সক্ষম না হলে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হবে আমাদের। তিনি আরও জানান, জেলায় করোনা উপসর্গে মৃত্যু ও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়ি লকডাউন স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা করলেও তা ফলোআপ না থাকায় সংক্রমণ বাড়ছে। এখনই দরকার জেলার লকডাউনকৃত বাড়ির ব্যক্তিদের তদারকি করা। আর তা করতে ব্যর্থ হলে জেলার হাজার হাজার মানুষ করোনা সংক্রমিত হবে।
বিষয়টি সম্পর্কে স্থানীয় নাগরিক নেতারা জানান, ভৌগোলিক অবস্থানের দিক বিবেচনায় সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা সবচেয়ে বেশি করোনা ঝুঁকিপূর্ণ। এখন সাতক্ষীরার মানুষ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সামনে সাতক্ষীরার জন্য কঠিন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। সেজন্য করোনা রোগীদের কথা ভেবে দ্রুত আইসিইউ ও শয্যা সংখ্যা বাড়ানো জরুরী। তিনি আরও জানান, জেলার বাইরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লক্ষ মানুষ পেটে তাগিদে কাজ করেন।
তাদের মধ্যেও অধিকাংশ মানুষের শিক্ষার হার অতি নগন্য। সম্প্রতি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় যখন দেশের প্রশাসন ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঠিক তখন করোনা সংক্রমিত এলাকার লকডাউন উপেক্ষা করে জেলায় প্রবেশ এখনও চলমান রেখেছে মানুষ। দিনের পর দিন জেলায় বৃদ্ধি পাচ্ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা। ওই সংক্রমিত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনদের পাশাপাশি করোনা উপস্বর্গে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দেদারছে জেলার মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকান, হাটবাজার, রাস্তাঘাটা ও বিভিন্ন জনসমাগম এলাকায় ঘুরাঘুরি করছে। তাদেরকে ঘরে রাখতে জেলার করোনার প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধিদের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মহাদুর্যোগ করোনা থেকে জেলার মানুষকে প্রাণে বাঁচাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধাকি ব্যক্তি জানান, করোনা ভাইরাস। নাম তার ভয়ঙ্কর। এই নামটা শুনলেই প্রত্যেকেই যেন আতঙ্কিত। মুহূর্তের মধ্যে একজনের থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আর মানুষের নি:শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গেই ছড়িয়ে যাচ্ছে এই রোগের জীবাণু। কোনওভাবেই আটকানো যাচ্ছে না এই ভাইরাস। কয়েক মাস দেশের ন্যায় সাতক্ষীরায় করোনার প্রতিষেধক টিকা চালু করা হলেও এর সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। তবে জেলায় প্রায় ২২ লক্ষ মানুষ বসবাস করলেও আইসিইউ এর বেড ৮টি ও করোনা রোগীদের জন্য ১৪০ টি বেড প্রস্তুত অপ্রতুল। সম্প্রতি এই ভাইরাসের সংক্রমণ জেলার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে বিপাকে পড়বেন রোগীর স্বজনরাও। তারা আরও জানান, প্রায় দু’সপ্তাহ দেশে লকডাউন চলমান। এরমাঝে সরকারের সকল নির্দেশনা অমান্য করে সীমিত আকারে কিছু কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলছেন। এতে স্বাভাবিক কারণেই রাস্তায় কিছু যানবাহন ও মানুষের চলাচল দেখা মিলছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের জন্য পূর্বের তুলনায় মোবাইলকোর্ট এখন বেশি পরিচালিত হচ্ছে। এরপরেও মানুষ ইচ্ছেমতো বাইরে বের হচ্ছেন। এতে ভেঙে পড়েছে সামাজিক দূরত্ব ব্যবস্থাপনাও।